সোনা, ডলার ও তেলের জটিল সমীকরণ: কীভাবে ওঠানামা করে সোনার দাম?

সোনা, ডলার ও অপরিশোধিত তেলের দামের মধ্যে জটিল সম্পর্ক কী? কীভাবে এই তিনটি উপাদান বিশ্ব বাজারে সোনার মূল্য নির্ধারণ করে, জেনে নিন বিস্তারিত।

Share:

ব্যুরো নিউজ, ১৯ অক্টোবর ২০২৬: আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের ওঠানামা হল একটি জটিল আর্থিক সমীকরণের ফল, যেখানে মার্কিন ডলার ও অপরিশোধিত তেলের মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। তবে, সোনার মূল্য শুধু চাহিদা-যোগানের উপর নির্ভরশীল নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডলারের শক্তি এবং তেলের দামের সম্পর্ক।

সাধারণত, মার্কিন ডলারের সঙ্গে সোনার দামের একটি বিপরীতমুখী সম্পর্ক দেখা যায়। ডলার শক্তিশালী হলে অন্যান্য মুদ্রার ধারকদের জন্য সোনা কেনা ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, ফলে চাহিদা কমে এবং সোনার দাম পড়ে যায়। এর উল্টোটা ঘটে যখন ডলার দুর্বল হয় তখন সোনা সস্তা হয়ে ওঠে, চাহিদা বাড়ে এবং দাম চড়ে যায়। অপরিশোধিত তেলের দামও সোনার উপর প্রভাব ফেলে। তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়ে, যা মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। মুদ্রাস্ফীতির সময়ে বিনিয়োগকারীরা তাঁদের অর্থের মূল্য ধরে রাখতে সোনার মতো মূল্যবান ধাতুতে বিনিয়োগ করেন, কারণ সোনাকে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি কার্যকরী রক্ষাকবচ হিসেবে দেখা হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে সোনার দামও বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।

তিন দশক ধরে সোনার মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে লক্ষ্য করা গেছে। ১৯৯৬ সালে সোনার গড় দাম ছিল প্রতি আউন্স প্রায় ৩৮৮ ডলার, যা ২০২৬ সালের অক্টোবরের শুরুতে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪,১৫০ ডলারে অর্থাৎ প্রায় এগারো গুণ। ভারতীয় মুদ্রার হিসেবে, ১৯৯৬-৯৭ সালে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার দাম ছিল প্রায় ৫,০৭১ টাকা, যা ২০২৬ সালের অক্টোবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১,৪৯,৫৭০ টাকায় অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ গুণ বৃদ্ধি। ভারতীয় মুদ্রার মূল্যে এই বড় ধরনের বৃদ্ধির কারণ কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বেড়ে যাওয়া নয়, বরং ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার মান কমে যাওয়াও এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। এই পরিসংখ্যানগুলোই ব্যাখ্যা করে যে, স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের ওঠানামা সত্ত্বেও কেন সোনা পারিবারিক সম্পদ ধরে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে টিকে আছে।

তবে ২০২৬ সালের ঘটনাপ্রবাহ এই প্রচলিত ধারার এক কৌতূহল উদ্দীপক ব্যতিক্রম। ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মুদ্রানীতি শিথিল হওয়ার প্রত্যাশার কারণে জানুয়ারিতে সোনার দাম প্রতি আউন্স প্রায় ৫,৬০০ ডলারে পৌঁছেছিল। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যখন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন স্বাভাবিক প্রত্যাশা অনুযায়ী সোনার দাম আরও বাড়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে এর দাম দ্রুত কমে যায় এবং পরবর্তী দর সংশোধনের সময় তা সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে প্রায় ২৭ শতাংশ হ্রাস পায়।

এই দরপতনের কারণ হচ্ছে গতিশীল ত্রয়ীর তৃতীয় উপাদান, অপরিশোধিত তেল। যুদ্ধের জন্য হরমুজ প্রণালী, যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়, বন্ধ হওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১২০ ডলারে পৌঁছায়, যা বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, সার উৎপাদন, শিল্পপণ্য উৎপাদন ও বিদ্যুৎ খরচের ব্যয় বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় সুদের হার অপরিবর্তিত রাখে বা বাড়িয়ে দেওয়ায় সুদপ্রদানকারী সম্পদগুলো শক্তিশালী হয় এবং মার্কিন ডলারেরও মান বাড়তে পারে। ফলে, যে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা তৈরি করে, সেই একই যুদ্ধ আবার এমন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিরও জন্ম দেয় যা সোনার দাম কমিয়ে দিতে পারে।