ব্যুরো নিউজ, ৩১ অক্টোবর ২০২৬: মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক তরজা আবার তুঙ্গে। এবার বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করে বসলেন শিবসেনা উদ্ধব গোষ্ঠীর নেতা সঞ্জয় রাউত।
তিনি বলেন, শিল্পপতি বিজয় মালিয়া আসলে কোনও ‘প্রতারক’ ছিলেন না। তাঁর মতে, কিংফিশার এয়ারলাইনস যখন ধ্বসে পড়ে এবং ঋণের বোঝা চরমে পৌঁছায়, তখন সংস্থাটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য দেশের বাঙ্কগুলোরই উচিত ছিল সাহায্য করা। বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে রাউত দাবি করেছেন যে, গত এক দশকে প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকার নীরবে অনেক বড় শিল্পপতির বিশাল অঙ্কের ঋণ মাফ করে দিয়েছেন কিন্তু মালিয়ার ঋণ মাফ করেননি যিনি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছুটা আর্থিক অবকাশ চেয়েছিলেন। তাঁর এই মন্তব্যে রাজনৈতিক মহলে জোর চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। রাউতের এই দাবির পর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি তিনি মালিয়ার বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপের ঘটনাকে লঘু করে দেখাতে চাইছেন?
রাউত সহানুভূতিশীল চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করলেও বিজয় মালিয়া ভারতে বড় ধরনের আইনি লড়াই ও ফৌজদারি কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। এই প্রাক্তন বিলিয়নেয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি তাঁর এখন বিলুপ্ত কিংফিশার এয়ারলাইনসের সঙ্গে সম্পর্কিত ৯,০০০ কোটি টাকারও বেশি ব্যাঙ্ক ঋণ পরিশোধ করেননি। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যাওয়ার পর, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের আবেদনের প্রেক্ষিতে তিনি ভারতের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ‘পলাতক অর্থনৈতিক অপরাধী’ ঘোষিত হন।
২০২০ সালের মে মাসে ভারতে প্রত্যর্পণের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে হেরে যাওয়া সত্ত্বেও, মালিয়া বিচারের মুখোমুখি হওয়ার জন্য ভারতে ফিরে আসেননি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাজ্যে জামিনে মুক্ত আছেন, আর এর মধ্যেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের বিষয়টি নিয়ে একটি গোপনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া, ২০২১ সালের জুলাই মাসে লন্ডনের একটি আদালত তাঁকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। সরকারি অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এর আগে সংসদে জানিয়েছিলেন যে, ‘প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট’ (PMLA)-এর অধীনে মালিয়া, নীরব মোদি ও মেহুল চোকসির মতো আর্থিক ঋণখেলাপিদের বাজেয়াপ্ত সম্পদ বিক্রি করে ব্যাংকগুলো প্রায় ১৩,১০৯ কোটি টাকা পুনরুদ্ধার করেছে।
২০২২ সালের জুলাই মাসে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে প্রথমত, নিজের সন্তানদের কাছে ৪ কোটি (৪০ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য গোপন করা এবং দ্বিতীয়ত, কর্ণাটক হাইকোর্টের নির্দেশকে ‘প্রকাশ্যে লঙ্ঘন’ করা, এই দুই অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। ২০১৭ সাল থেকে ঝুলে থাকা আদালত অবমাননার একটি মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট মালিয়াকে চার মাস কারাদণ্ড এবং ২,০০০ টাকা জরিমানার আদেশ দেয়। বিচারপতি ললিতের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ তাঁকে চার সপ্তাহের মধ্যে সুদসহ ওই ৪ কোটি মার্কিন ডলার ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত সতর্ক করে দেয় যে, এই নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হলে তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। আদালত উল্লেখ করে যে, পুরো আইনি প্রক্রিয়াজুড়ে মালিয়া বিন্দুমাত্র অনুশোচনা দেখাননি; এমনকি সশরীরে বা আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে হাজির হওয়ার নোটিশগুলোকেও তিনি উপেক্ষা করেছেন। ভারতীয় আদালত যে যুক্তরাজ্য থেকে তাঁর প্রত্যর্পণের জন্য আর অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না—এই বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করে, সর্বোচ্চ আদালত “আইনের মর্যাদা সমুন্নত রাখার” লক্ষ্যে সাজা ঘোষণার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সঞ্জয় রাউত সম্ভবত বিজেপিকে নিশানা করতে গিয়ে এই মন্তব্য করেছেন। তবে, তাঁর এই বক্তব্য মালিয়া কাণ্ডের মতো একটি গুরুতর আর্থিক অপরাধকে হালকা করে দেখার সামিল বলে মনে করছেন অনেকে। এই মন্তব্যের পর বিরোধীরাও সঞ্জয় রাউতকে একহাত নিয়েছেন। তাঁদের মতে, এই ধরনের মন্তব্য দেশের বিচারব্যবস্থা এবং ব্যাঙ্কগুলির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে।








