ব্যুরো নিউজ, 8 নভেম্বর ২০২৬:
অমর্ত্য সেন: যুক্তি, মানবিকতা, বিতর্ক ও প্রজ্ঞার এক অনন্য জীবনজন্মদিনে বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিককে শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা।কিছু মানুষ শুধু নিজের সাফল্যের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকেন না, তাঁরা তাঁদের চিন্তা, দর্শন এবং প্রশ্ন করার সাহস দিয়ে সময়কে প্রভাবিত করেন। অমর্ত্য সেন তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। অর্থনীতির জটিল তত্ত্বকে যিনি মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাধীনতা, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি শুধু একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ নন, তিনি এমন এক চিন্তাবিদ, ১৯৩৩ সালের ৩ নভেম্বর শান্তিনিকেতনে জন্ম অমর্ত্য কুমার সেনের।
তাঁর জন্ম এমন এক পরিবেশে, যেখানে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার এক অসাধারণ আবহ ছিল। তাঁর মাতামহ ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর বিশিষ্ট অধ্যাপক এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ। বাবা আশুতোষ সেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক এবং মা অমিতা সেনের মধ্যেও ছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। ফলে ছোটবেলা থেকেই অমর্ত্য সেনের বেড়ে ওঠার মধ্যে বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য ও মানবিকতার এক সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল।শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে শান্তিনিকেতনে।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। সেখানে মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে প্রশ্ন করা, নিজের মতো করে ভাবা এবং যুক্তির সাহায্যে সত্যকে বোঝার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হতো। ছোটবেলাতেই তিনি আশপাশের গ্রামের দরিদ্র ও নিরক্ষর শিশুদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনার কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। মানুষের জীবনযন্ত্রণা ও সামাজিক বৈষম্যকে তিনি দূর থেকে দেখেননি, ছোটবেলা থেকেই তার সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন।
কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনার পর তিনি পাড়ি দেন কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে। মাত্র তেইশ বছর বয়সে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগদান এবং নতুন অর্থনীতি বিভাগ গড়ে তোলার দায়িত্ব পাওয়া তাঁর জীবনের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। পরবর্তী সময়ে দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্স, লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড এবং কেমব্রিজের মতো বিশ্বের প্রথম সারির প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার লাভ করেন। কল্যাণমূলক অর্থনীতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান।
১৯৯৯ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত করে। Nobel Prize অর্থনীতির বাইরে তাঁর সবচেয়ে বড় লড়াই: ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধেঅমর্ত্য সেনের গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুর্ভিক্ষ। ১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তর তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, অনাহার এবং খাদ্যের অভাবে অসহায় মানুষের দুর্দশা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছিল, খাদ্য উৎপাদন থাকা সত্ত্বেও মানুষ অনাহারে মারা যায় কেন?এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই তিনি তৈরি করেন তাঁর বিখ্যাত গবেষণার ভিত্তি।
১৯৮১ সালে প্রকাশিত Poverty and Famines: An Essay on Entitlement and Deprivation বইয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, দুর্ভিক্ষের কারণ সব সময় খাদ্যের সামগ্রিক অভাব নয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, কাজের সুযোগ, খাদ্যের বণ্টন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী হতে পারে।তাঁর এই তত্ত্ব অর্থনীতির জগতে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেশে খাদ্যের ভাণ্ডার পূর্ণ থাকলেও যদি সাধারণ মানুষের সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে উন্নয়নের পরিসংখ্যান দিয়ে তাদের ক্ষুধা মেটানো যাবে না
।এখানেই শেষ নয়। তাঁর Development as Freedom বইয়ে তিনি উন্নয়নের এক নতুন দর্শন তুলে ধরেন। তাঁর মতে, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা, সেতু, শিল্প বা মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা পায়।মেয়েদের শিক্ষা, নারীর অধিকার, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়েও তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাবনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই প্রশ্ন—একজন মানুষ সমাজে কী কী সুযোগ পাচ্ছেন এবং সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজের জীবনকে কতটা উন্নত করতে পারছেন? ব্যক্তিগত জীবন: সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, শোক ও নতুন করে বাঁচার গল্পঅমর্ত্য সেনের ব্যক্তিগত জীবনও যথেষ্ট ঘটনাবহুল।
তাঁর জীবনকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও পুরস্কারের তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখলে মানুষ অমর্ত্য সেনকে সম্পূর্ণভাবে চেনা হবে না।১৯৫৮ সালে তাঁর বিয়ে হয়েছিল বিশিষ্ট বাঙালি কবি, সাহিত্যিক ও অধ্যাপক নবনীতা দেবসেনের সঙ্গে। নবনীতা দেবসেন বাংলা সাহিত্যজগতের এক অত্যন্ত পরিচিত ও সম্মানিত নাম। তাঁদের দুই কন্যা—অন্তরা ও নন্দনা। অন্তরা সাংবাদিকতা ও প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত এবং নন্দনা সেন অভিনেত্রী ও লেখক হিসেবে পরিচিত।পরবর্তীকালে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটে।
১৯৭০-এর দশকে তাঁদের বিবাহিত জীবনের অবসান হয়।এরপর অমর্ত্য সেনের জীবনে আসেন ইভা কলর্নি। তিনি ছিলেন ইতালীয় অর্থনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্য। ১৯৭০-এর দশকে তাঁদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই সন্তান ইন্দ্রাণী ও কবীর। কিন্তু এই সম্পর্কও দীর্ঘস্থায়ী সুখের হয়নি। ১৯৮৫ সালে ক্যানসারে ইভার মৃত্যু হয়। দুই ছোট সন্তানকে নিয়ে অমর্ত্য সেনকে জীবনের এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে তিনি ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ এমা রথসচাইল্ডকে বিয়ে করেন। এমাও কেমব্রিজ ও হার্ভার্ডের শিক্ষাজগতের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে তাঁদের সম্পর্কের মধ্যে বৌদ্ধিক ও গবেষণামূলক সঙ্গও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।ব্যক্তিগত জীবনের এই অধ্যায়গুলি দেখায়, আন্তর্জাতিক খ্যাতি ও অসাধারণ মেধার অধিকারী একজন মানুষের জীবনেও সম্পর্কের ভাঙন, প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণা এবং নতুন করে জীবন সাজানোর অভিজ্ঞতা থাকে।
Nobel Prize অমর্ত্য সেনকে ঘিরে বিতর্ক ও মতবিরোধঅমর্ত্য সেন এমন একজন মানুষ, যাঁকে নিয়ে শুধু প্রশংসাই হয়নি, হয়েছে বিস্তর বিতর্কও। বিশেষ করে ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং দেশের সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মন্তব্য বিভিন্ন সময়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।তিনি বহুবার ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ধর্মনিরপেক্ষতার অবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির সমালোচনা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের পক্ষে তাঁর অবস্থান রাজনৈতিক মহলের একাংশের বিরাগভাজন হয়েছে।তাঁর সমালোচকদের বক্তব্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিচার করতে গিয়ে তিনি অনেক সময় সরকারের পরিকাঠামোগত সাফল্য, শিল্পায়ন এবং প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক দিকগুলিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না।
আবার তাঁর সমর্থকদের বক্তব্য, একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন বিচার করতে গেলে শুধু জিডিপি দিয়ে সবকিছু মাপা যায় না। মানুষের জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সুযোগের সমতা বিবেচনায় রাখতেই হবে।তাঁর দুর্ভিক্ষ সংক্রান্ত তত্ত্বও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
খাদ্যের মোট সরবরাহের পাশাপাশি বণ্টন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়ার যে ব্যাখ্যা তিনি দিয়েছিলেন, তা অত্যন্ত প্রভাবশালী হলেও দুর্ভিক্ষের প্রতিটি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে এই তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ থাকতেই পারে। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া জরুরি নয়। কিন্তু যুক্তি দিয়ে কোনও চিন্তাবিদকে প্রশ্ন করা আর তাঁর চিন্তাকে অগ্রাহ্য করা এক বিষয় নয়। অমর্ত্য সেনের জীবন আমাদের সেই বিতর্কের সংস্কৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়।তাঁর কাজের উত্তরাধিকারঅমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কারের অর্থের একটি অংশ দিয়ে ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রতীচী ট্রাস্ট।
ভারত ও বাংলাদেশের শিক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং লিঙ্গবৈষম্য সংক্রান্ত সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে রয়েছে The Argumentative Indian, The Idea of Justice, Development as Freedom, Poverty and Famines, The Country of First Boys এবং Home in the World। বিশেষ করে The Argumentative Indian বইয়ে তিনি ভারতীয় সভ্যতার বিতর্ক, যুক্তি, বহুত্ববাদ ও মুক্তচিন্তার ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছেন। Amartya Sen জন্মদিনে শুভেচ্ছা








