৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিতে উত্তাল বাংলাদেশ! পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভে সংঘর্ষ, আগুন পুলিশের গাড়িতে

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার আগেই বাংলাদেশে পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভে রণক্ষেত্র। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নেওয়ায় উত্তেজনা তুঙ্গে।

Share:

ব্যুরো নিউজ, ৪ নভেম্বর ২০২৬: ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে উত্তপ্ত বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কেন্দ্রগুলি। শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ঢাকা, গাজীপুর ও সাভারে একাধিক জায়গায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, কোথাও কারখানার সামনে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ উঠেছে। শ্রমিক অসন্তোষের জেরে একাধিক পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে।

গত ১ নভেম্বর রবিবার থেকে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের বিভিন্ন এলাকায়। শ্রমিকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের ন্যূনতম মাসিক বেতন বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করতে হবে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৩ হাজার টাকা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লেও তাঁদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে সংসার চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, জ্বলল গাড়ি

ঢাকার মিরপুর এলাকায় বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উত্তপ্ত হয়। মিরপুর-১০ ও মিরপুর-১১ মেট্রোস্টেশন সংলগ্ন এলাকায় জমায়েত করেন পোশাকশ্রমিকদের একাংশ। পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিতে গেলে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। আন্দোলনকারীদের একাংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন বলে অভিযোগ। পাল্টা কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।

এই সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কয়েকটি এলাকায় কাঠের আসবাব জ্বালিয়েও বিক্ষোভ দেখান শ্রমিকেরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। সংঘর্ষের জেরে মিরপুরের কয়েকটি মেট্রোস্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচলও ব্যাহত হয়।

৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ নভেম্বর শ্রমিক অসন্তোষের জেরে ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার মিলিয়ে অন্তত ৫২৯টি তৈরি পোশাক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা BGMEA-র সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু এই তথ্য জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গাজীপুর ও সাভারের কয়েকটি শিল্পাঞ্চলেও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে গাজীপুরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা BGB মোতায়েন করা হয়। পরে কয়েকটি এলাকায় অবরোধ উঠে গেলে যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।

মজুরি বোর্ড গঠন, রাজনৈতিক চাপানউতোরও তুঙ্গে

শ্রমিকদের অসন্তোষ প্রশমনে বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ঘোষণা করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। তবে শ্রমিকদের দাবির পূর্ণ সমাধান এখনও হয়নি।

এদিকে বিক্ষোভের পিছনে রাজনৈতিক যোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও শুরু হয়েছে চাপানউতোর। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং সরকারের উপদেষ্টা মাহদী আমিনের অভিযোগ, অস্থিরতার পিছনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কিছু পোশাকশিল্প মালিকের ভূমিকা থাকতে পারে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ মহল পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছে। এই রাজনৈতিক অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া এখনও বাকি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাকশিল্পের গুরুত্ব

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ তৈরি পোশাকশিল্প। লক্ষ লক্ষ শ্রমিক এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাক রপ্তানি থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশটি। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শ্রমিক অসন্তোষ ও কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে রপ্তানি, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে।

এর মধ্যেই ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়েছে। আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তবে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির দাবিই সামনে এসেছে।

সব মিলিয়ে, শ্রমিকদের বেতনবৃদ্ধির দাবি, শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক চাপানউতোর—তিন দিক থেকেই চাপে বাংলাদেশ। মজুরি বোর্ডের উদ্যোগে পরিস্থিতি কতটা সামাল দেওয়া যায়, এখন সেদিকেই নজর।