বন্যার জলে ভেঙেছিল প্রতিমা, তৈরি হয় ৪৫ ফুটের কংক্রিটের ‘বড়মা’! ক্ষীরপাইয়ে ভক্তদের ঢল

পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাইয়ের ৪৫ ফুটের 'বড়মা' কালীপুজোয় লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম। বন্যার ধাক্কা সামলে ফের সেজে উঠেছে এই জাগ্রত প্রতিমা।

Share:

ব্যুরো নিউজ, ৪ নভেম্বর ২০২৬: কালীপুজো মানেই বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে আলোর উৎসব, ভক্তির আবহ এবং দেবীদর্শনের জন্য মানুষের ভিড়। তবে পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাইয়ের ‘বড়মা’ মন্দিরের আকর্ষণ একেবারেই আলাদা। প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার বিশাল কংক্রিটের কালীপ্রতিমা দেখতে প্রতি বছর দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য ভক্ত। কালীপুজো উপলক্ষে ইতিমধ্যেই মন্দির চত্বরে শুরু হয়েছে প্রস্তুতি। দেবীর আশীর্বাদ পেতে এবারও বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগমের আশা করছেন স্থানীয়রা।

বন্যার স্মৃতি থেকেই তৈরি ৪৫ ফুটের প্রতিমা

পশ্চিম মেদিনীপুরের ক্ষীরপাই পৌরসভার চিরকুমডাঙা এলাকায় অবস্থিত এই মন্দির। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৩ বছর আগে শ্মশান এলাকায় মাটির চালায় ছোট আকারের কালীপ্রতিমা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই প্রতিমা পরিচিত ছিল ‘ছোটমা’ নামে।

একবার ভয়াবহ বন্যায় গোটা এলাকা জলের তলায় চলে যায়। জলের প্রবল স্রোতে মাটির চালা ও প্রতিমা ভেঙে যায়। এরপরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এমন একটি স্থায়ী মন্দির ও প্রতিমা তৈরি করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে বন্যার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়েও দেবীমূর্তির ক্ষতি না হয়। সেই ভাবনা থেকেই নির্মিত হয় প্রায় ৪৫ ফুট উচ্চতার বিশাল কংক্রিটের কালীমূর্তি। ধীরে ধীরে ভক্তদের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘বড়মা’ নামে।

দেবীর হাতে পৃথিবী ও সাদা পায়রা, শান্তির বার্তা

ক্ষীরপাইয়ের বড়মার প্রতিমার বিশেষত্ব শুধু তার বিশাল উচ্চতা নয়, দেবীর হাতে থাকা প্রতীকগুলিও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে। চার হাতের একটিতে রয়েছে পৃথিবীর প্রতিকৃতি, অন্য একটি হাতে সাদা পায়রা। বাকি দুই হাতে রয়েছে খড়্গ ও নরমুণ্ড। ভক্তদের বিশ্বাস, পৃথিবীর প্রতিকৃতি ও সাদা পায়রা বিশ্বশান্তি এবং পৃথিবীকে রক্ষা করার বার্তা বহন করে। শ্মশানকালীর রূপে পূজিত এই দেবীর এক পা শিবের বুকে এবং অন্য পা মাটিতে রাখা।

পুরোহিত ছাড়াই পুজো, নেই দক্ষিণা নেওয়ার রীতি

বড়মায়ের মন্দিরের পুজোর নিয়মও বেশ ব্যতিক্রমী। অমাবস্যার তিথি ছাড়া বছরের অন্যান্য দিনে মন্দিরে কোনও পুরোহিত থাকেন না। ভক্তরাই নিজের হাতে দেবীর পুজো দিতে পারেন। মন্দিরে দক্ষিণা নেওয়ার ব্যবস্থাও নেই। এমনকী বড়মায়ের পুজোয় পশুবলির প্রচলনও নেই। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বড়মায়ের কাছে প্রার্থনা করলে মনস্কামনা পূরণ হয় এবং আরোগ্য লাভ করা যায়। সেই বিশ্বাস থেকেই বছরের প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা লেগে থাকে। তবে কালীপুজোর অমাবস্যায় ভিড় থাকে সবচেয়ে বেশি।

ক্ষীরপাইয়ের পরিচিতি ছাড়িয়ে ছড়িয়েছে বড়মায়ের খ্যাতি

একসময় স্থানীয় এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই মন্দিরের পরিচিতি। বর্তমানে ক্ষীরপাই ও চন্দ্রকোনা ছাড়াও পশ্চিম মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং ভিন জেলা থেকে বহু মানুষ বড়মায়ের দর্শনে আসেন। বিশালাকার কংক্রিটের প্রতিমা, ব্যতিক্রমী পুজোর রীতি এবং বন্যার স্মৃতি জড়িয়ে থাকা প্রতিষ্ঠার ইতিহাস—সব মিলিয়ে ক্ষীরপাইয়ের বড়মা এখন ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। কালীপুজোকে সামনে রেখে মন্দিরে চলছে প্রস্তুতি। এবারও দেবীদর্শনের আশায় বহু মানুষের সমাগম হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।